প্রবৃত্তি কঠিন শত্রু এর বিরোধীতা- বড় যুদ্ধ

প্রকাশিত: ২:৩২ অপরাহ্ণ, অক্টোবর ১৮, ২০২০

মুফতি জাকারিয়া মাসউদ

মনের খেয়াল খুশি মত চলার নামই হলো প্রবৃত্তির দাসত্ব। প্রবৃত্তি মানুষের সবচেয়ে বড় শত্রু । যত শত্রুর বিরুদ্ধে মানুষকে সংগ্রাম করতে হয়, যুদ্ধ করতে হয়, তার মধ্যে প্রবৃত্তি সবচেয়ে কঠিন শত্রু যার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা অপরিহার্য দায়িত্ব; তাই বিশ্বনবী সঃ বলেন, প্রবৃত্তির বিরোধীতা করা সবচেয়ে বড় জিহাদ বা যুদ্ধ। তাইতো বিশ্বনবী সঃ যুদ্ধের ময়দান থেকে ফিরে এসে বলতেন, তোমরা এখন ছোট জিহাদ থেকে বড় জিহাদের দিকে ফিরে এসেছো। দাইলামী, কানযুল উম্মাল

প্রবৃত্তির সংজ্ঞা :আভিধানিক অর্থে কোন বস্তুর প্রতি আকর্ষণ এবং ভালোবাসাকে প্রবৃত্তি বলে। আল-মাগরিব ফি তারতিবিল মু‘রাব: ২/৩৯২ পারিভাষিক অর্থে প্রবৃত্তি বলা হয় শরীয়তের আবেদন ছাড়া কামনার চাহিদা অনুযায়ী কোন বস্তু থেকে স্বাদ গ্রহনের প্রতি মনের আকর্ষণকে। (আত্তারিফাত লিল জুরজানি: ৩২০)
আল্লাহ তায়ালা প্রবৃত্তির অনুসরণকে সরাসরি নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন, তোমরা বিচার করতে যেয়ে প্রবৃত্তির অনুসরণ করনা ।( সুরা নিসা ১৩৫), অন্য আয়াতে আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, হে দাউদ, আমি তোমাকে পৃথিবীতে প্রতিনিধি করেছি । অতএব, তুমি মানুষের মাঝে ন্যায়সঙ্গতভাবে শাসন কর এবং খেয়াল খুশির অনুসরণ করনা, তা তোমাকে আল্লাহর পথ থেকে বিচ্যুত করে দেবে। (সুরা সদ আয়াত ২৬) আবার অন্যত্র আল্লাহ তায়ালা পথভ্রষ্টদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করাকেও নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, এবং তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করবেন না, যারা আমার নির্দেশনাবলিকে মিথ্যা বলে, যারা পরকালে বিশ্বাস করেনা এবং যারা স্বীয় পালনকর্তার সমতুল্য অংশীদার স্থাপন করে। সুরা আনআম আয়াত ১৫১ আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবীকে কাফিরদের উদ্দেশ্যে বলতে নির্দেশ দিয়েছেন যে, আপনি বলে দিন, আমি তোমাদের খুশিমত চলবো না। কেননা তাহলে আমি সুপথগামীদের অন্তর্ভূক্ত হবনা। (সুরা আনআম আয়াত ৫৬) আল্লাহ তায়ালা আরও ইরশাদ করেন, এবং এই সম্প্রদায়গুলোর প্রবৃত্তির অনুসরণ করোনা, যারা পূর্বে পথভ্রষ্ট হয়েছে এবং অনেককে পথভ্রষ্ট করেছে, তারা সরল পথ থেকে বিচ্যুত হয়ে পড়েছে।(সুরা মায়িদা আয়াত ৭৭) আল্লাহ তায়ালা আরও বলেন, যার হৃদয় আমার স্বরণ থেকে গাফেল করে দিয়েছি, যে নিজের প্রবৃত্তির অনুসরণ করে এবং যার কার্যকলাপ হচ্ছে সীমা অতিক্রম করা, আপনি তার অনুসরণ করবেননা। (সুরা কাহফ, আয়াত ২৮)
এ সকল আয়াত দ্বারা মহান আল্লাহ তায়ালা কাফেরদের প্রবৃত্তির কথা বলেছেন অর্থাৎ যারা আল্লাহ তায়ালা কে অস্বিকার করে। তাদের প্রবৃত্তি তো শয়তানের অনুসরণেই পরিচালিত হয় সুতরাং তাদের অনুসরণ অর্থই হলো শয়তানের অনুসরণ করা তাই আল্লাহ তায়ালা তাদের প্রবৃত্তির অনুসরণ করাকে কঠিন ভাবে নিষেধ করেছেন। আবার বিশ্বনবী সঃ ঐ ব্যাক্রি নিন্দা করেছেন, যে ব্যাক্তি তার নিজের নফসের প্রবৃত্তির অনুসরণে গুনাহ করে। হযরত আবু ইয়ালা শাদ্দাদ বিন আউস রাঃ থেকে বর্ণিত রাসুল সাঃ বলেন, এবং অক্ষম ঐ ব্যাক্তি যে নিজেকে প্রবৃত্তির অনুসারী বানিয়েছে। (ইবনে মাজাহ হাদিস নং ৪২৬০)
প্রবৃত্তির বিরোধীতার উপকার: প্রবৃত্তির বিরোধিতা করতে পারলেই কোন মানুষ হয়ে যাবে কামেল মুমিন । আর তখন সে ব্যাক্তি আল্লাহ তায়ালার হুকুমের সামনে নিজেকে অবনত করতে পারবে আর সে হয়ে যাবে জান্নাতের অধিবাসী। যেমনটি আল্লাহ তায়ালা ইরশাদ করেন, যে ব্যাক্তি তাঁর পালনকর্তার সামনে দন্ডায়মান হওয়াকে ভয় করে এবং প্রবৃত্তির চাহিদা থেকে নিজেকে নিবৃত্ত রাখে, তার ঠিকানা হবে জান্নাত। ( সুরা নাজিয়াত, আয়াত ৪০-৪১)
তবে শুধু প্রবৃত্তি কল্পনার মধ্যে সীমা বদ্ধ থাকলে তার কোন শাস্তি হবেনা যতক্ষন তা আমলে পরিনত না হবে। এ জন্যই বার বার বলা হয়েছে প্রবৃত্তির অনুসরন করোনা অনুসরণ বলতে শুধু চিন্তা করাকে বুঝায়না । অনুসরণ হলো বাস্তবে রুপদান করা। সুতর্ংা যখন কাজে পরিণত হবে তখন তার শাস্তি ভোগ করতে হবে। হযরত আবু হুরায়রা রাঃ থেকে বর্ণিত রাসুল সাঃ বলেছেন, বনি আদমের ওপর তার জিনার অংশ লেখে রাখা হয়েছে, অবশ্যই সে তা প্রাপ্ত হবে। চোখের জিনা হলো নজর করা, কানের জিনা হলো শ্রবণ করা, জিহবার জিনা হলো কথা বলা, হাতের জিনা হলো স্পর্শ করা, পায়ের জিনা হলো গমন করা, অন্তর আকৃষ্ট হয় ও কামনা করে,আর লজ্জাস্থান তাকে বাস্তবায়ন করে অথবা মিথ্যা প্রতিপন্ন করে। মুসলিম শরীফ হাদিস নং ২৬৫৭
আল্লাহ তায়ালার নিকট প্রার্থনা করি তিনি যেন আমাদের সকলকে প্রবৃত্তির অনুসরণ থেকে বেঁচে থাকার তৌফিক দান করেন। আমিন

লেখক : প্রধান মুফতি, কাশফুল উলুম নেছারীয়া মাদরাসা। সিংড়া, নাটোর।

সূত্র: ইনকিলাব