শায়খে গাজিনগরী ও শায়খে কাতিয়া রহ.

প্রকাশিত: ১০:২৯ অপরাহ্ণ, এপ্রিল ১৩, ২০১৯

মাওলানা এখলাসুর রহমান (কাতিয়া-ইংল্যান্ড প্রবাসী)  ::

মাওলানা আব্দুল হক শায়খে গাজিনগরী রাহ. ১৯২৮ সালে সুনামগঞ্জ জেলার দক্ষিণ সুনামগঞ্জ উপজেলার ১১নং পাথারিয়া ইউনিয়নের অন্তর্গত গাজীনগর গ্রামের সম্ভ্রান্ত এক মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর সম্মানিত পিতার নাম মরহুম কেরামত আলী মুন্সি ও সম্মানিতা মাতার নাম মুছাম্মাৎ হানিফা খাতুন। শায়খে গাজিনগরী রাহ.’র পিতা-মাতা উভয়ই দ্বীনদার, পরহেজগার ও খোদাভীরু ছিলেন। শিশু আব্দুল হক মায়ের দুগ্ধ পালনকালীন সময়েই মাথার উপর থেকে মমতাময়ী মায়ের ছায়া উঠে যায়।
প্রাথমিক শিক্ষা : আব্দুল হক শায়খে গাজিনগরী শৈশবে তাঁর মামার বাড়ী দিরাই উপজেলার শরীফপুর প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষার সূচনা করেন। এখানে তিনি তৃতীয় শ্রেণী পর্যন্ত লেখা-পড়া করেন।
জটিল রোগে আক্রান্ত : শরীফপুরে তৃতীয় শ্রেণীতে পড়ার সময় হযরত একবার এক জটিল রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশয়ী হয়ে পড়েন। তাকে সুস্থ করার জন্য অনেক ঔষধ-পথ্যের ব্যবস্থা করার পরও যখন সুস্থ হলেন না, তখন যুগ শ্রেষ্ঠ ওলী, যার কথা ভাটি-বাংলার মানুষ শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করে, তিনি হলেন শাহ সূফি হযরত মাওলানা সিকান্দার আলী রাহ.। যিনি সূফি সাহেব নামে খ্যাত, সেই মনীষির দোয়ার বরকতে হযরত পূর্ণ সুস্থ্য হয়ে উঠেন এবং দ্বীনি শিক্ষার জন্য তাঁকে মাদরাসায় প্রেরনের জন্য পরামর্শ দেন।

মাদরাসা শিক্ষার সূচনা : কঠিন এই রোগ থেকে হযরত সুস্থ হওয়ার পর হযরত সূফি সাহেবের প্রতিষ্ঠিত দরগাহপুর মক্তব মাদরাসায় ভর্তি হন। দরগাহপুর মক্তব মাদরাসায় হযরত সুফি সাহেব, মাওলানা আব্দুল মুছাব্বির পারকুলী, মাওলানা ছানা উল্লাহ রাহ. প্রমূখ উস্তাদদের নিকট তিনি প্রাথমিক কিতাবাদি অধ্যয়ন করেন। আর এখানেই লেখা-পড়ার প্রতি তাঁর আগ্রহ ও তীক্ষ্ম মেধা শক্তির বিকাশ ঘটে।
মাধ্যমিক শিক্ষা : জ্ঞান তাপষ মহান এ সাধক ইলমে দ্বীন অর্জনের জন্যে দরগাহপুর থেকে হবিগঞ্জ জেলার বানিয়াচং আলিয়া মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে নাহবেমীর জামাত পর্যন্ত প্রায় চার বছর অধ্যয়ন করেন। উলে্লখ্য যে, বানিয়াচং আলিয়া মাদরাসায় লেখাপড়ার সময় ১৯৪৫ সালে একবার শায়খুল ইসলাম হযরত হোসাইন আহমদ মাদানী রাহ.’র বানিয়াচং আগমন ঘটে। তাঁর আগমন নিয়ে এলাকায় অনাকাংখিত একটি ঘটনার অবতারণা হলে হযরত মাদানী রাহ.’র প্রতি তাঁর অগাধ ভক্তি ভালোবাসার প্রকাশ ঘটে তখন। যার ফলে শায়খে গাজিনগরী রাহ. কে হবিগঞ্জ কারাগারে দীর্ঘ একমাস কারাবরণ করতে হয়।
সিলেট আলিয়া মাদরাসা : বানিয়াচংয়ে ৪ বছর অধ্যয়নের পর ১৯৪৮ সালে চলে আসেন সিলেট আলিয়া মাদরাসায়। এখানে কিছুদিন পড়ার পর মাদরাসার ছাত্রদের চাল-চলন, আচার-আচরণ তাঁর ভালো লাগেনি বলে সিলেট থেকে চলে যান জামিয়া ইউনুসিয়া বি-বাড়ীয়ায়। জামিয়া ইউনুসিয়ায় অত্যন্ত সুনামের সাথে ছানোবিয়্যাহ ৩য় বর্ষ অর্থাৎ মুখতাছারুল মা’আনী জামাত পর্যন্ত অধ্যয়ন করেন। সেখানে তাঁর উল্লেখযোগ্য উস্তাদদের মধ্য অন্যতম হলেন, মুনাযিরে জামান ফখরে বাঙাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রাহ., শায়খুল হাদীস আল্লামা সিরাজুল ইসলাম রাহ.।
সহপাঠীদের মধ্য অন্যতম হলেন, শায়খুল হাদীস মুফতি মাওলানা নূরুল্লাহ সাহেব দা.বা., শায়খুল হাদীস মাওলানা মুনিরুজ্জামান সাহেব, মাওলানা আব্দুল মালিক গাজিনগরী ছদর সাব হুজুর প্রমূখ।
শায়খে গাজিনগরী রাহ. শৈশবকাল থেকেই অত্যন্ত মেধাবী ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী ছিলেন। জামিয়া ইউনুসিয়াম থাকাকালীন সময়ে একবার তাঁর এক উস্তাদ তাকে বললেন, আব্দুল হক! হেদায়াতুন্নাহু মুখস্ত করে আমাকে শুনাতে হবে, শিক্ষকতা জীবনে এর প্রয়োজন অনেক। স্বীয় উস্তাদের প্রতি তাঁর এতো ভক্তি-শ্রদ্ধা ছিল যে, শিক্ষকদের আদেশ নতশীরে মেনে নিতেন। উস্তাদের আদেশ বিধায় অল্প ক’দিনের মধ্যই তিনি হেফায়াতুন্নাহ কিতাবখানা পূর্ণ মুখস্ত শুনিয়ে দিলেন তাঁর উস্তাদকে। এতে ঐ উস্তাদ যার পরনাই আনন্দিত হলেন।

দারুল উলূম দেওবন্দ গমন : শায়খে গাজিনগরী জামিয়া ইউনুসিয়ায় ৩ বছর পড়ালেখার পর উচ্চ শিক্ষা অর্জনের জন্যে এবং আকাবিরদের ফয়েজ ও সুহবত লাভের আশায় ১৩৭০ হিজরি সনে মাদরে ইলমী, বিশ্ববিখ্যাত ইসলামী বিদ্যাপীঠ ভারতের দারুল উলূম দেওবন্দ গমন করেন। সেখানে তিনি অত্যন্ত সুনাম ও সুখ্যাতির সাথে দীর্ঘ ৪ বছর লেখা পড়া করে ১৩৭৫ হিজরী সনে দাওরায়ে হাদীসের জামাতে উত্তীর্ণ হন। দাওরায়ে হাদীসের জামাতে হাদীসে রাসূল সা.’র কালজয়ী গ্রন্থ বুখারী শরীফ এবং তিরমিযি শরীফ শায়খুল ইসলাম সায়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানীর রাহ.’র নিকট থেকে দারস লাভে ধন্য হন। এছাড়া আল্লামা ইব্রাহীম বলিয়াভী, শায়খুল আদব আল্লামা এজাজ আলী, মুফতিয়ে আজম মুফতি শফী রাহ. প্রমূখ যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিসীনে কেরামের নিকট সিহাহ সিত্তার অন্যান্ন কিতাবাদী অধ্যয়ন করেন।
আধ্যাত্মিক শিক্ষা এবং খেলাফত লাভ : শায়খ আব্দুল হক গাজিনগরী রাহ. দারুল উলূম দেওবন্দে দাওরায় হাদীস সমাপনান্তে কুতবে আলম, শায়খুল ইসলাম সায়্যিদ হোসাইন আহমদ মাদানী রাহ.’র খেদমতে নিজেকে নিয়োজিত রাখেন এবং আরো ২ বছর সেখানে অবস্থান করেন। এ সময়ে তিনি আপন মুর্শিদের খেদমতের পাশাপাশি ইলমে তরীকতের সনদে খেলাফত লাভে ধন্য হন এবং নিজ মুর্শিদের নির্দেশে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন।
কর্ম জীবন: ১৩৭৭ হিজরী সনে যখন তিনি দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে উচ্চ শিক্ষা ও আধ্যাত্মিকতার সনদ অর্জন করে দেশে প্রত্যাবর্তন করেন, তখন ফখরে বাঙাল আল্লামা তাজুল ইসলাম রাহ. তাঁর প্রতি আসক্ত হয়ে মাদানী রাহ.’র অনুমতিক্রমে ঐতিহ্যবাহী দ্বীনি শিক্ষা প্রতিষ্ঠান জামিয়া ইউনুসিয়া বি-বাড়ীয়ায় শিক্ষকতার মহান পেশায় তাঁকে নিযুক্ত করেন। সেখানে এক বছর দায়িত্ব পালনের পর আপন মুর্শিদ পত্রের মাধ্যমে তাকে জানিয়ে দিলেন ‘‘মাকান যা কর মদরসা কায়িম কর’’ তখন তিনি আপন উস্তাদ ফখরে বাঙাল তাজুল ইসলাম রাহ.’র ইজাযত নিয়ে বাড়িতে চলে আসেন এবং নিজ গ্রাম দরগাহপুরে ১৩৬৪ বাংলায় প্রতিষ্ঠা করলেন ঐতিহ্যবাহী ইসলামী বিদ্যাপীঠ আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাতের দূর্জয় এক কেল্লা- দারুল উলূম দরগাহপুর। তাঁর প্রতিষ্ঠিত দারুল উলূম দরগাহপুরের প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম হিশেবে আমৃত্যু দায়িত্ব পালন করে গেছেন।
দীর্ঘ এই ৫১ বছরে তিনি দারুল উলূম দরগাহপুরকে তিলে তিলে গড়ে তুলেছেন এবং অত্যন্ত দক্ষতার সাথে ইহতেমামীর দায়িত্ব পালন করে জীবনের পড়ন্ত বিকেলে এসে একবার মাদরাসার ইহতেমামীর দায়িত্ব ছেড়ে দিলেও কিছুদিনের মধ্যেই আবার তাঁকে পীড়াড়ীড়ি করে ইহতেমামীর দায়িত্ব দেয়া হলে তিনি সম্মত হন এবং মৃত্যু পর্যন্ত ইতমেনানের সাথে মাদরাসার দায়িত্ব পালন করে গেছেন। এখানে উল্লেখ্য যে, দারুল উলূম দেওবন্দ থেকে বলে আসার পর দরগাহপুর নামে যে মাদরাসাটি তিনি প্রতিষ্ঠা করেছেন, এ মাদরাসাটি তাঁর শৈশবে থাকলেও পাকিস্তান আমলে এর কোন অস্তিত্ব এমনকি এখানে মাদরাসা ছিল বলে কোন চিহ্নও ছিলনা। তিনি এখানে পূণরায় মাদরাসার ভিত্তি স্থাপন করেন।
বিবাহ: সুন্নাতে রাসূল সা. পালনার্থে খলিফায়ে মাদানী শায়খে গাজিনগরী রাহ. জীবনে দু’টি বিবাহ করেন। তন্মধ্যে প্রথম বিবাহ জামিয়া ইউনূসিয়া বি-বাড়ীয়ায় শিক্ষক থাকাকালীন সময়ে ১৩৭৭ হিজরীতে দিরাই উপজেলার তারাপাশা গ্রামের সম্ভ্রান্ত এক শায়খ পরিবারের আদর্শ রমণী মোছাম্মাৎ মুমতাজ বেগমের সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন। তাঁর গর্ভে মোট ১৩জন সন্তানাদি জন্মগ্রহণ করেন। তন্মধ্যে ৬ ছেলে ও ৭ মেয়ে। ছেলেদের মধ্যে ৪জন ছোটকালেই মারা যায়। অপর দু’জন হলেন, খলিফায়ে ফেদায়ে মিল্লাত ও শায়খে কৌড়িয়া রাহ. শায়খ মাওলানা আব্দুল করীম সাহেব। তিনি বর্তমানে আপন পিতার স্থলাভিষিক্ত হয়ে বাইয়াতের কাজ চালিয়ে যাচ্ছেন। অপরজন মরহুম শায়খ মাওলানা আব্দুল বাসিত রাহ.। তিনি ৩৮ বছর বয়সে পিতার আগেই হইধাম ত্যাগ করেন। তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীর গর্ভে কোন সন্তানাদি নেই।
রাজনৈতিক জীবন : ইসলামী রাজনীতির অঙ্গনে শায়খ আব্দুল হক গাজিনগরী রাহ.’র ছিল সক্রিয় ভূমিকা। আকাবির ও আসলাফের প্রতিষ্ঠিত রাজনৈতিক সংগঠন জমিয়তে উলামায়ের ইসলাম বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় সদস্য, সহ-সভাপতি অত:পর মৃত্যু অব্দি কেন্দ্রীয় সভাপতির দায়িত্বে নিয়োজিত ছিলেন। ১৯৭০ এর জাতীয় নির্বাচনে জমিয়ত প্রার্থী হিশেবে খেজুরগাছ প্রতীক নিয়ে সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়া তিনি ফেদায়ে মিল্লাত সায়্যিদ হযরত আস’আদ মাদানী রাহ. প্রতিষ্ঠিত ইসলাহুল মুসলিমীন বাংলাদেশ’র সভাপতির দায়িত্বও পালন করেন। হকের পক্ষে আর বাতিলের বিরুদ্ধে শায়খে গাজিনগরী ছিলেন সোচ্চার ভূমিকা পালনকারী। ছিলেন রাজপথে লড়াকু অগ্রসেনানী। সমাজ দরদী হিসেবে সমাজের দূর্গত, বঞ্চিত, অসহায় মানুষের পাশে দাড়াতেন, সাধ্যমত সাহায্যের চেষ্টা করতেন।
সমাজ সংস্কারে শায়খে গাজিনগরী : বাতিলের আতংক শায়খে গাজিনগরী সমাজ রাষ্ট্রের সব অন্যায় অপকর্মের বিরুদ্ধে ছিলেন মূর্তিমান এক আতংক। ভাটি অঞ্চল হিশেবে খ্যাত সুনামগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলকে মহামারীর মত জড়িয়ে থাকা-যাত্রাগান, যাত্রাপালা, ঘৌড় দৌড়, নৌকা দৌড়, নাচ-গান সহ সমাজ বিধ্বংসী রোগগুলোকে তিনি প্রাণপন চেষ্টা চালিয়ে উৎখাত করতে সক্ষম হন। পুরো সুনামগঞ্জ এলাকায়ই তার প্রচেষ্টায় কুসংস্কার দূর হয়ে ইসলামী পরিবেশ কায়েম হয়।
এছাড়া কাদিয়ানী, মওদুদীবাদী ফিৎনা যখনই মাথা চড়া দিয়ে উঠত, তখনই তিনি তা প্রতিহত করতে প্রস্তুত হয়ে যেতেন এবং মুনাজারার চ্যালেঞ্চ ছুড়ে দিতেন। এসব ফেৎনার মোকাবেলায় যারা অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন, তাদের মধ্যে শায়খে গাজিনগরী অন্যতম।
আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাতের ভাষ্যকার শায়খে গাজিনগরী: আত্মার চিকিৎসক শায়খে গাজিনগরী রাহ. বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে, অজপাড়াগাঁয়ে, গাড়িতে, নৌকা, কখনো মাইলের পর মাইল হেঁটে হেঁটে গিয়ে মানুষদেরকে ওয়াজ নসীহত করতেন। দ্বীনের তা’লীম দিতেন। পথভুলা, পথহারা মানুষ জনকে সঠিক পথের সন্ধান দিলেন। বায়আত করতেন, আত্মার চিকিৎসা করতেন। মানুষদের বুঝিয়ে শুনিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে ইসলাম মুখী করতেন।

খেলাফত প্রদান : আশিকে মাদানী শায়খে গাজিনগরী রাহ. সাধারণত কোন বয়ানের পর সিলসিলায়ে মাদানীর আমানত বণ্টনের জন্যে মুরীদ বানাতেন। এর মধ্যে আবার যারা মুজাহাদা মুশাহাদায় অগ্রগামী তাদেরকে তিনি খেলাফতের ইজাযত দান করতেন।
উল্লেখ্য, শায়খে গাজিনগরী রাহ. এর সম্মানীত খলিফা মোট ৬জন: ১. মরহুম শায়খ মাওলানা আব্দুল হালীম সাহেব, কানাইঘাট, সিলেট। ২. শায়খ মাওলানা কামাল উদ্দীন সাহেব, মৌলভী বাজার। ৩. শায়খ মাওলানা হাদিয়াতুল্লাহ সাহেব, বি-বাড়ীয়া। ৪. শায়খ মাওলানা মুহিব্বুর রহমান সাহেব, ছাতক, সুনামগঞ্জ। ৫. শায়খ মাওলানা নজরুল ইসলাম, গোয়াইনঘাট, সিলেট।
হজ্বব্রত পালন : মদফুনে মক্কী শায়খে গাজিনগরী রাহ. জীবনে ৫ বার পবিত্র হজ্বব্রত পালন করেন। শেষবার হজ্ব করার জন্য পূণ্যনগরী মক্কা-মদীনায় গেলে মাওলার প্রেমে পড়ে গিয়ে সেখান থেকে আর দেশে ফেরা হয়নি।
ইন্তেকাল: ‘‘কুল্লু নাফসিন যা ইকাতুল মাউত’’ অর্থাৎ প্রত্যেক প্রাণীকেই মৃত্যুর স্বাদ অস্বাদন করতে হবে। মৃত্যুকে কেউ রুখতে পারবেনা বা পারার সাধ্য কারো নেই। এই অনিবার্য বাস্তবতাকে সামনে রেখে আমাদের মাথার উপর এতোদিন ছায়া হয়ে থাকা মহান মনীষী, খলিফায়ে মাদানী আব্দুল হক শায়খে গাজিনগরী রাহ. আমাদেরকে, আত্মীয়-স্বজনসহ দেশ-বিদেশের অসংখ্য ভক্ত মুরীদানকে শোক সাগরে ভাসিয়ে ২০০৮ সালের ২রা ডিসেম্বর সোমবার স্থানীয় সময় রাত ৩ ঘটিকার (বাংলাদেশ সময় সকাল ৬টা) সময় কালেমায়ে শাহাদত পড়তে পড়তে মহান মাওলার ডাকে সাড়া দিয়ে তার সাক্ষাতের জন্য চলে যান ফিরে না আসার দেশে। চিরদিনের আমাদেরকে এতীম করে পাড়ি জমান পরপারে। ভাগ্যবান শায়খে গাজিনগরী রাহ.কে জান্নাতুল মুয়াল্লার ৮১/১৬ নং কবরে উম্মুল মু’মিনীন হযরত খাদিজার রাযি.’র কবরের পাশে তাকে দাফন করা হয়। আল্লাহ তায়ালা তাঁকে জান্নাতের উচ্চ মাকাম দান করুন। আমীন।

 

 

কুতুবে বাঙ্গাল আমিন উদ্দীন শায়খে কাতিয়া (রহ.)

মহান আল্লাহ রাববুর আলামিনের সন্তুষ্টি অর্জনের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে ইলমুল ওহী অর্জন ও ইলমে তাসাউফ এর অমীয় সুধায় নিজের জীবনকে সাজিয়ে যারা যুগশ্রেষ্ঠ বুজুর্গ বা ওলী আল্লাহ হিসেবে নিজেকে সু-প্রতিষ্ঠিত করেছেন তন্মধ্যে হযরত মাওলানা আমিন উদ্দীন শায়খে কাতিয়া রহ: অন্যতম। একজন খাটি ওলী আল্লাহর প্রতিকৃতি এ বুজুর্গ আলেমে দ্বীনের মধ্যে সমুজ্জ্বল। হযরত মাওলানা আমিন উদ্দীন শায়খে কাতিয়াকে দেশের উলামা মাশায়েখগণ কুতবে বাঙ্গাল ও মুজাহিদে মিল্লাত উপাধি প্রদান করেছিলেন। মর্দে মুজাহিদ ক্ষণজন্মা এই আলেম মাওলানা আমিন উদ্দীন শায়খে কাতিয়া ১৯০৮ সালে সুনামগঞ্জ জেলার ঐতিহ্যবাহী ক্বাতিয়া গ্রামে এক সম্ভ্রান্ত মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম শেখ মোহাম্মদ কনাই মিয়া এলাকার অন্যতম তালুকদার ছিলেন। মাতার নাম ফাতিমা খানম। হযরত শায়খে কাতিয়া কুতবুল আলম আওলাদে রাসুল আল্লামা সায়্যিদ হুসাইন আহমদ মাদানীর রহ: অন্যতম অনুরক্ত ও শাগরিদে রশিদ ছিলেন। জালালী তবিয়ত ও জেহাদী জযবায় উজ্জীবিত এই মর্দে মুজাহিদ একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকেই ভয় করতেন না। তিনি দেশ বিদেশে ‘‘কাতিয়ার শেখছাব” নামেই ব্যাপক পরিচিতি অর্জন করেছেন। মাওলানা আমিন উদ্দীন শায়খে কাতিয়া স্বীয় গ্রামের প্রাইমারি স্কুল এবং পাটলী প্রাইমারি স্কুলে পঞ্চম শ্রেণী পর্যন্ত লেখাপড়ার পর নবীগঞ্জ থানার দিঘলবাগ গ্রামে নিউ স্কীম মাদরাসায় ৩ বছর লেখাপড়ার পর কোন একরাতে একটি আশ্চর্যজনক স্বপ্ন দেখতে পান যে, কুতবুল আলম শায়খুল ইসলাম সাইয়্যেদ হুসাইন আহমদ মদনী রহ: তাকে স্বপ্ন যোগে আলিফ, লাম, মীম সবক দিচ্ছেন। সেই স্বপ্ন দেখার পর তিনি অস্থির হয়ে পড়েন। এরপর জগন্নাথপুর থানার ঐতিহ্যবাহী সৈয়দপুর গ্রামের তৎকালীন প্রসিদ্ধ আলেমদের সাথে পরামর্শ করে তিনি গোলাপগঞ্জ থানার বাঘা মাদরাসায় ভর্তি হন। সেখানে ২ বছর লেখাপড়া করেন। অতঃপর হযরত মদনী রহ: সিলেট আগমন করলে স্বপ্ন বর্ণনার প্রেক্ষাপটে তিনি হযরত মদনীর র: সাথে ভারতের দেওবন্দ মাদরাসায় চলে যান। সেখানে কুতবুল আলম মদনীর একান্ত খাছ সাগরিদ হিসেবে তাঁর সান্নিধ্যে থেকে ৭ বছর লেখাপড়া করে সর্বোচ্চ ডিগ্রী অর্জন করে দেশে চলে আসেন। উল্লেখ্য, দ্বীনি শিক্ষার সর্বপ্রথম সবক নেন মাদানী রহ: নিকট থেকে স্বপ্ন যোগে এবং সর্বশেষ সবক ও গ্রহণ করেন মাদানী রহ: নিকট থেকে সরাসরি। শায়খে কাতিয়া দেশে ফেরার পর দেওবন্দ মাদরাসার আদলে নিজ গ্রামে একটি ক্বওমী মাদরাসা প্রতিষ্ঠার জন্য দীর্ঘদিনের লালিত স্বপ্ন বাস্তবায়নে ব্রতী হন। অবশেষে কাতিয়া গ্রামের ধর্মানুরাগী মুরববীয়ানদের সক্রিয় সহযোগিতায় ১৯৫১ সালে অলইতলী ও কাতিয়া গ্রামের মধ্যবর্তী স্থানে ঐতিহ্যবাহী ইসলামী বিদ্যাপীঠ জামেয়া ইসলামিয়া দারুল উলুম অলৈতলী কাতিয়া মাদরাসার প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে উক্ত মাদরাসার মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছেন। উক্ত মাদরাসার ব্যয়ভার সংকুলান করতে অশীতিপর বৃদ্ধ শায়খে কাতিয়া বছরের পর বছর ধরে ১২টি মাসই বিভিন্ন স্থানে সফর করতেন। দেশ ছাড়াও ইউরোপ, আমেরিকা, কানাডাসহ মধ্যপ্রাচ্যের সব কয়টি দেশেই তাঁর অগণিত ভক্ত, মুরিদান রয়েছেন। ঐ সকল মুরিদানের দাওয়াতে তিনি এ পর্যন্ত প্রায় ৬০ বার বিভিন্ন দেশ সফর করেছেন। এছাড়াও মহান আল্লাহর একান্ত সান্নিধ্য লাভের কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে প্রায় ৫০ বারের অধিক হজব্রত পালনের সৌভাগ্য অর্জন করেছেন।

শায়খে কাতিয়া সিলেট সুনামগঞ্জ ও হবিগঞ্জ জেলার প্রায় অর্ধ শতাধিক মাদরাসার প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম হিসেবে দায়িত্ব আঞ্জাম দিয়েছেন। সিলেট বিমানবন্দর এলাকার সন্নিকটে জামেয়া আমিনিয়া মংলিপার হাজী নগর মাদরাসা তিনি ১৯৯৫ ইং সালে প্রতিষ্ঠা করেন। শহরের সোবহানীঘাট বশিরুল উলুম হাফিজিয়া মাদরাসা তিনি প্রতিষ্ঠা করেন। উভয় মাদরাসার তিনি ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা মুহতামিম। সিলেট নয়াসড়ক খেলাফত বিল্ডিং এ দারুল হাদীস আল মাদানিয়া মাদরাসা ও তিনি সুচারুরূপে পরিচালনা করে আসছিলেন। তিনি বাংলাদেশ ক্বওমী মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, আজাদ দ্বীনি এদারায়ে তালিম বাংলাদেশ এবং সুনামগঞ্জ এদারার অন্যতম উপদেষ্টা পদে আসীন ছিলেন। বৃহত্তর সিলেটের অধিকাংশ মাদরাসা অথবা উপরোক্ত শিক্ষা বোর্ডগুলো কোন সমস্যা বা সংকটে নিপতিত হলে নিরূপায় হয়ে তাঁর শরণাপন্ন হলে তিনি প্রাণান্তকর প্রচেষ্টার মাধ্যমে এর সমাধান দিতে কুণ্ঠাবোধ করতেন না। বিশেষ করে সুনামগঞ্জ জেলার প্রত্যন্ত অঞ্চলে হলেও যে কোন সামাজিক সংকটে বা সমস্যা সমাধানে অগ্রণী ভূমিকা পালন করতেন। সুনামগঞ্জ জেলা প্রশাসনসহ প্রতিটি স্থরের প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ বিভিন্ন কর্মকান্ডে তাকে যথাযথ মূল্যায়ন করত। এ ছাড়াও বৃহত্তর সিলেটের রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তা ও মন্ত্রী, এমপি মহোদয়গণ ও শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তাঁকে সম্মান প্রদর্শন করতেন। জীবন সংগ্রামে এক অকুতোভয় ও নির্ভীক সৈনিক সত্যের সাধক মুজাহিদ শায়খে কাতিয়ার সংগ্রাম মুখর জীবনের বিস্তারিত বিবরণ এ সংক্ষিপ্ত পরিসরে তুলে ধরা সম্ভব নয়। অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে এক সংগ্রামী কৃতি পুরুষ সিলেট বিভাগের অন্যতম স্বনামখ্যাত ও বর্ষীয়ান এই আলেমে দ্বীন আজীবন ইসলাম বিরোধী যেকোন অসামাজিক কার্যকলাপের বিরুদ্ধে সিংহের মত গর্জে উঠতেন। হযরত শায়খে কাতিয়ার নিজ মুখে বর্ণনাকৃত কিছু ঘটনাবলীর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে- তদানীন্তন পাকিস্তান আমলে স্বৈরশাসক আয়ুব খান কর্তৃক মুসলিম পারিবারিক আইন পাশের বিরুদ্ধে সিলেটের সর্বস্তরের উলামা-মাশায়েখগণ প্রতিবাদ মুখর হয়ে ঐতিহাসিক রেজিষ্ট্রারি মাঠে এক বিশাল প্রতিবাদ সমাবেশের ডাক দিলে তৎকালীন জেলা প্রশাসক রেজিষ্ট্রারি মাঠে সভা সমাবেশ নিষিদ্ধ ঘোষণা করে এবং রেজিষ্ট্রারি মাঠের প্রধান গেইট তালাবদ্ধ করে দেয়।

এদিকে প্রতিবাদ সমাবেশে যোগ দিতে আসা সিলেট শহর লোকে লোকারণ্য, কিন্তু কেউ রেজিষ্ট্রারি মাঠে যাওয়ার বা প্রবেশ করা সাহস পাচ্ছেন না। এমতাবস্থায় মর্দে মোজাহিদ হযরত শায়খে কাতিয়া রহ: তখনকার সর্বজন শ্রদ্ধেয় বুজুর্গ রানাপিং মাদরাসার মুহতামিম হযরত মাওলানা রিয়াছত আলী শায়খে ছখরিয়া কে সাথে নিয়ে নিজ হাতে গেইটের তালা ভেঙ্গে ফেলেন এবং যথাস্থানেই প্রতিবাদ সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়। রেজিষ্ট্রারি মাঠে উক্ত প্রতিবাদ সমাবেশ শেষে তিনি জিন্দাবাজারস্থ হোটেল রমনায় অভ্যর্থনা কক্ষে টাঙ্গিয়ে রাখা স্বৈরাচার আয়ুব খানের ফটো ঈমানী জযবার সাহসীকতার সাথে নিজ হাতে ভেঙ্গে জ্বালিয়ে দেন। ১৯৮০ ইং সালে তৎকালীন প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান এর সিলেট আগমন উপলক্ষে সিলেট বিমান বন্দর থেকে সার্কিট হাউস পর্যন্ত পুলিশী ব্যারিকেড রাখা হয়। তৎমুহূর্তে শায়খে কাতিয়া চন্দনটুলা থেকে দরগাহ শাহজালাল মাদরাসায় যেতে চাইলে পুলিশ হযরত শায়খে কাতিয়ার রাস্তা আগলে দাঁড়ায়। ব্যাপার জানতে চাইলে জনৈক পুলিশ ইন্সপেক্টর জানায় এই মুহূর্তেই প্রেসিডেন্ট আসছেন তাই আপনাকে রাস্তা দেয়া সম্ভব নয়। তখন হযরত শায়খে কাতিয়া খুব উত্তেজিত কণ্ঠে হাতের আশা (লাঠি) উচিয়ে বলেন, তোমার প্রেসিডেন্টকে গিয়ে বল যে, ইসলামের প্রেসিডেন্ট এই মুহূর্তে আল্লাহর ঘরে যাবেন। যাও, আর আমার রাস্তা থেকে সরে দাঁড়াও। সিংহ বিক্রম সুলভ ধমক খেয়ে পুলিশ ইন্সপেক্টর ভয় পেয়ে যায় এবং তৎক্ষণাত হুজুরের রাস্তা ছেড়ে দিতে বাধ্য হয়।
১৯৮৪ সালে স্বৈরাচার এরশাদ সরকারের শাসনামলে সুনামগঞ্জের এক্সিভিশন ভাঙ্গার জন্য হযরত শায়খে কাতিয়ার আহবানে হাজার হাজার জনতার পদভারে যখন সুনামগঞ্জ শহর প্রকম্পিত, মিছিলে মিছিলে মুখরিত ঠিক তখন ব্যাপারটি সুরাহার উদ্দেশ্যে সিলেটের একমাত্র মন্ত্রী খাদ্য উপমন্ত্রী মেজর ইকবালের বাসায় যান। বাসা থেকে জানিয়ে দেয়া হয় মন্ত্রী এখন ঘুমিয়ে আছেন। বেলা তখন দুপুর ১২টা। শায়খ ধমক দিয়ে বলেন ইকবাল সাহেবকে জাগাও গিয়ে বলো আমার হাজার হাজার জনতা আজ সুনামগঞ্জে মৃত্যুবরণ করবে। আর তিনি দায়িত্বশীল মন্ত্রী হয়ে দিনে দুপুরে ঘুমিয়ে থাকবেন। এটা কিছুতেই মেনে নেয়া যায়না। হুজুরের গর্জনী শোনে মন্ত্রী মেজর ইকবাল ঘুম থেকে উঠে এসে সাথে সাথে তাঁর কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। তৎক্ষণাৎই নিজ গাড়ীতে করে শায়খে কাতিয়াকে নিয়ে এসে সমাবেশে উপস্থিত হন এবং এক্সিভিশন বন্ধের ঘোষণা দেন।

১০৮৫/৮৬ সালে একইভাবে দুর্বার সাহস নিয়ে সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই থানায় এবং জগন্নাথপুর থানা সদরে বিশাল গানের প্যান্ডেল ভেঙ্গে ফেলেন। তখনকার সময়ের আরেকটি ঘটনা সিলেট শহরে বন্দর বাজার এক সাপুড়ের সাপ নাচানি অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে লাথি মেরে সাপের বাক্স ভেঙ্গে ফেলেন। সাপগুলো তেল তেলীয়ে দৌড়ে প্রাণ বাঁচায়। সিলেট বন্দর বাজারের একজন গায়ক গানের আসর রাস্তার মধ্যে গান পরিবেশন করতে থাকলে তিনি হঠাৎ এলে গায়কের হাত থেকে দুতারান কেড়ে নিয়ে সজোরে আঘাত করলে তা চূর্ণ বিচূর্ণ হয়ে যায়।
একদা জগন্নাথপুর থানার রাণীগঞ্জ বাজারে ফজল শাহ নামক এক বাউল গায়কের বিদেশী দামী বেহালা সহ সকল বাধ্যযন্ত্র কেড়ে নিয়ে ভেঙ্গে চুরমার করে কুশিয়ারা নদীতে নিক্ষেপ করেন। এতে গায়ক ফজল শাহর ভক্ত মুরিদানরা তাঁকে ঘিরে ফেলে এবং দূরে থেকে হুমকি ধমকি দেখাতে থাকে। এমতবস্থায় তিনি কুরআন শরীফ পড়তে বসে যান। তৎক্ষণাৎই এলাকার গণ্যমান্য মুরববীয়ানগণ ভক্ত গায়ক ফজল শাহসহ তার সহচরদের শাসিয়ে দিয়ে সরিয়ে দেন এবং হুজুরের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করেন। উল্লেখ্য যে, বৃহত্তর সিলেটে কোন এক সময় তথাকথিত সুন্নী ও ওয়াহাবী নামে ফেরকাবাজিতে সিলেট সরগরম হয়ে উঠেছিল। তখনকার তাঁর ঘোর বিরোধীরাও তার সামনে এলে বিরোধিতা করার সাহস পেত না। তারাও শ্রদ্ধাবনত চিত্তে তাঁকে যথাযথভাবে সম্মান প্রদর্শন করত হযরত শায়খে কাতিয়া। এ ব্যাপারে নিজ মুরিদান ও শিক্ষকদের বলতেন যে যারা আমার বিরোধিতা করে অথবা আমাকে গালি দেয় তাদেরকে কটু কথা ও বলিও না। সম্ভব হলে তাকে আমার গালি দেয়ার পরিবর্তে মিষ্টি মুখ করিয়ে দিও। তখনকার সময়ে সংশ্লিষ্ট ঘটনাবলীর শিকার হয়ে শয্যাশায়ী অবস্থায় ফুলতলীর পীর সাহেব সিলেট হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় হযরত শায়খে কাতিয়া কমলা, আপেল, আঙ্গুর নিয়ে ফুলতলী পীর সাহেবকে দেখতে যান। তিনি ঘোরতর বিরোধীদেরকে সাথে নিয়ে খাবার খেতেও দ্বিধাবোধ করতেন না।

তিনি মেহমান ছাড়া খাবার খেতেন না। নিয়মিত তাহাজ্জুদ গোজার আল্লাহর এই ওলী জামায়াত ছাড়া নামাজ পড়তেন না। বন্দর বাজার জামে মসজিদে আসলে নামাজের সময় মিস্ত্রীদেরকে কাজে দেখতে পেলে খুব রাগান্বিত হতেন। গত কয়েক বছর পূর্বে সোবহানীঘাট বশিরুল উলুম মাদরাসার ভূমি নিয়ে একটি জালিয়াত চক্র মিথ্যা অভিযোগ দিলে পুলিশ সেখানে যায়। আমি (মাহমুদুল হাসান) খবর পেয়ে সেখানে গিয়ে আমার পরিচিত কতোয়ালী মডেল থানার একজন সাব ইন্সপেক্টর ও কয়েকজন পুলিশ কনস্টেবল দেখতে পাই। শায়খে কাতিয়া তখন এদ্বারা ভবনে বোর্ডের বৈঠকে ছিলেন। আমি ইন্সপেক্টরকে হযরত শায়খে কাতিয়ার সাথে সরাসরি কথা বলার জন্য অনুরোধ করি। তিনি এতে রাজি হলে এ দ্বারা অফিসে তাদেরকে নিয়ে যাই। এদ্বারা হলরুমে প্রবেশ করার পর পরই হযরত শায়খে কতিয়া জিজ্ঞাসা করলেন (তখন আছরের নামাজের সময়) নামাজ আদায় করছেন। এস.আই ও তার সাথিরা থমকে দাঁড়ায়, হযরত শায়খে কাতিয়া বললেন প্রথমে আল্লাহর ডিউটি করবেন তারপর সরকারের ডিউটি। অজুর পানির ব্যবস্থা দেয়ার জন্য বললেন পুলিশ ইন্সপেক্টর তার সাথিদের নিয়ে হযরতের কথা মত অজু করে নামাজ আদায় করলেন এবং পরে তাঁর নিকট থেকে দোয়া চেয়ে বিদায় নিয়ে চলে গেলেন। সাহাবা আজমাঈনের বাস্তব নমুনা সুন্নাত নববীর পাবন্দ এ বুজুর্গ প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর জিকিরে মশগুল থাকতেন। সফরে রওয়ানা দিলে স্বীয় গাড়ীতে হাফিজে কুরআনকে দিয়ে তেলাওয়াত করাতেন নিজে মনোযোগ দিয়ে শুনতেন। শায়খে কাতিয়া জমিয়তে উলামায়ে ইসলাম বাংলাদেশ এর অন্যতম কেন্দ্রীয় পৃষ্ঠপোষক ছিলেন। তিনি তদানিন্তন পাকিস্তান আমলে জাতীয় পরিষদ নির্বাচনে ৬ থানা নিয়ে গঠিত আপার কাউন্সিলের প্রার্থী ছিলেন। জমিয়তে উলামায়ে ইসলামের টিকিটে দুই বারই এ নির্বাচনে প্রার্থী হয়ে বিজয়ী প্রার্থীর নিকটতম প্রতিদ্বনদ্বী ছিলেন।

১৯৭১ইং এর মুক্তিযুদ্ধকালীন সময়ে তিনি স্বতন্ত্র ভূমিকা পালন করেন। তিনি নিজ এলাকা তথা ৯নং পাইলগাঁও ইউনিয়নকে পাকিস্তানের হানাদার বাহিনীর আক্রমণ থেকে হেফাজত করতে বলিষ্ঠ ভূমিকা পালন করেন। নিজ ইউনিয়নের হিন্দু বসতীপূর্ণ গ্রামগুলোকেও রক্ষা করেন। পাকিস্তানী হানাদার বাহিনীর সম্পর্কে হযরত শায়খে কাতিয়া মন্তব্য করতেন যে, এদের নির্বিচারে গণহত্যা অন্যায় নির্যাতন ও বর্বরতা প্রমাণ করে এদেশে তারা বেশিদিন টিকে থাকতে পারবে না। কুতবে আলম শায়খুল ইসলাম হযরত মাদানীর একান্ত শাগরিদ ও খাদিম ছিলেন শায়খে কাতিয়া। হযরত মদনীর ইন্তিকালের সময় শায়খে কাতিয়া কাছে না থানায় খেলাফতের সবক দিয়ে যেতে পারেননি। তাই মাদানী র: এর অন্যতম খলিফা হবিগঞ্জ জেলার নুরগাঁও নিবাসী ডা: শেখ আলী আসগর নুরী স্বীয় মুর্শেদ ও পীর হযরত মাদানীর ইজাজত প্রাপ্ত হয়ে শায়খে কাতিয়াকে খেলাফত দান করেন। বর্তমানে সিলেট বিভাগ সহ ময়মনসিংহ অঞ্চল মিলে শায়খে কাতিয়ার হাজার হাজার মুরিদান রয়েছেন। এ পর্যন্ত শায়খে কাতিয়ার ইজাজত প্রাপ্ত বহু সংখ্যক খলিফা রয়েছেন। পারিবারিক জীবনে তিনি বানিচং মুল্লাবাড়ী নিবাসী মাওলানা আবু ছামি সাহেবের কন্যা মাজেদা খাতুন এর সাথে বৈবাহিক জীবনে আবদ্ধ হন। তিনি ৫ পুত্র ও ৪ কন্যা সন্তানের জনক, হযরতের জ্যৈষ্ঠ সাহেবজাদা হাফিজ মাওলানা আলহাজ্ব ইমদাদ উল্লাহ কাতিয়া মাদরাসার নাইবে মুহতামিম হিসেবে কর্মরত আছেন। ২য় সাহেবজাদা আন্তর্জাতিক ক্বারী মাও. উবায়দুল্যাহ খেলাফত বিল্ডিং আল মাদানিয়া মাদরাসার ভারপ্রাপ্ত মুহতামিম এর দায়িত্বে আছেন। ইউসুফ আমিনী কানাডা প্রবাসী, ইসমাঈল আমিনী কাতিয়া মাদরাসার শিক্ষক, মাওলানা ইসহাক আমিনী ব্যবসায়ী। হযরত শায়খে কাতিয়ার পরিবারের নাতি-নাতনিদের মধ্যে প্রায় ৩৯ জন হাফেজ হাফেজা, কারীয়া ও আলেম আলেমা রয়েছেন।

হযরত শায়খে কাতিয়া যেকোন ছেলে মেয়ে উপযুক্ত হলে তাদেরকে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার উপর গুরুত্বারোপ করতেন। তাদের অভিভাবকদের জোর দিয়ে বলতেন এদের বিয়ে শাদীর ব্যবস্থা কর। কারণ উপযুক্ত ছেলে মেয়ে যথাসময়ে বিয়ে শাদী করালে ব্যভিচার এর মত পাপ কাজে জড়াবে না। যুগশ্রেষ্ঠ এ মহান বুজুর্গ আলেম দীর্ঘদিন থেকে বার্ধক্যজনিত রোগে ভোগছিলেন। গত ৯ রমযান থেকে সিলেট শহরের একটি ক্লিনিকে চিকিৎসাধীন ছিলেন। প্রতিদিন সিলেটের মডার্ন ক্লিনিকে অসংখ্য মানুষের ভিড় থাকতো। রমযান মাসে প্রতিদিন সিলেটের প্রায় সকল মসজিদে তাঁর আরোগ্যের জন্য দোয়া অনুষ্ঠিত হত। রমযানের শেষ দিকে তাঁর কিছুটা শারীরিক উন্নতির খবরও শোনা যেত। কিন্তু পবিত্র রমযানের শেষ দিনে শুক্রবার তিনি অসংখ্য অগণিত ভক্ত অনুরক্তদের সকল আশা ভরসাকে ভুলিয়ে দিয়ে মহান রাববুল আলামিনের ডাকে সাড়া দিলেন। হয়তো আল্লাহর এই ওলীর কামনা বাসনা ছিল মাহে রমযানে যেন তার প্রভুর সান্নিধ্যে লাভ করেন। এ ধরনের সৌভাগ্য ই বা ক’জনের হয়। রমযান মাস তারপর শুক্রবার। হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী এর অনেক ফজিলত রয়েছে। বলতে হয় তিনি মহা সৌভাগ্যবান। তার নামাযে জানাযা পরদিন সিলেটের ঐতিহাসিক শাহী ঈদগাহে পবিত্র ঈদুল ফিতরের নামাযের পর অনুষ্ঠিত হয়। সিলেট বিভাগ ছাড়াও অন্যান্য জেলা হতে হাজার হাজার মুসল্লিয়ানগণ গাড়ী রিজার্ভ করে রাতেই সিলেট রওয়ানা হয়ে যান। শাহী ঈদগাহের আশাপাশ ছাড়িয়ে যায় লোক লোকারণ্যে। অনেক দূর-দূরান্ত থেকে মুসল্লীগণ মাইকের আওয়াজ শোনতে পাননি। এ যেন সিলেটবাসীর জন্য ঈদ আনন্দের দিন শোকের মাতম। ঈদের জামাতের পর হযরত শায়খে কাতিয়ার রহ. স্মরণকালের বৃহত্তম জানাযা শাহী ঈদগাহে অনুষ্ঠিত হয়। পরে হযরতের মরদেহ তার নিজ গ্রাম কাতিয়ায় নিয়ে যাওয়া হয়। হযরতের নিজ হাতে গড়া নবীজির স. প্রিয় বাগান জামেয়া ইসলামিয়া কাতিয়া মাদরাসা ময়দানে তাকে সমাহিত করা হয়। আল্লামা আমিন উদ্দীন শায়খে কাতিয়া আজ আমাদের মাঝে আর নেই। কিন্তু রয়েছে তার কালজয়ী আদর্শ। মহানবীর সুন্নত ও সাহাবাদের বাস্তব জীবনের নমুনা বাস্তবায়নের সংগ্রাম।
মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করি হে আল্লাহ আপনার এ ওলীর মার্যাদা আপনি বুলন্দ করুন। আপনার জান্নাতের সু-উচ্চ স্থানে তাঁকে স্থান দিন।