বারিধারা ওয়াজাহাতি জোড়ে গৃহীত ৮ সিদ্ধান্ত

প্রকাশিত: ৯:৫২ অপরাহ্ণ, নভেম্বর ১৯, ২০১৮

বিশেষ প্রতিনিধি: তাবলীগ জামাতে দিল্লীর নিজামুদ্দিনের মাওলানা সাদ কান্ধলভি একতরফাভাবে নিজেকে আমীর ঘোষণা এবং ইসলামী আক্বিদাবিরোধী বিভ্রান্তিকর মতবাদ প্রচারকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট সংকটে সাধারণ মুসলমানদের মাঝে ওলামায়ে কেরামের অবস্থান সুস্পষ্ট করত: ইসলামের সঠিক আক্বিদা-বিশ্বাস তুলে ধরার জন্য দেশব্যাপী পর্যায়ক্রমে ওয়াজাহাতি জোড় অনুষ্ঠিত হচ্ছে। ১৭ নভেম্বর শনিবার বেলা ২টা থেকে রাজধানীর জামিয়া মাদানিয়া বারিধারা মাদরাসা মাঠে বড় পরিসরে এক ওয়াজাহাতি জোড় অনুষ্ঠিত হয়। এর আয়োজন করেছেন গুলশান, বনানী, ভাটারা, বাড্ডা, খিলক্ষেত থানার উলামায়ে কেরাম ও তাবলীগ জামাতের সাথী ভাইয়েরা। এতে বয়ান করেন দেশের শীর্ষ পর্যায়ের উলামায়ে কেরাম এবং তাবলীগ জামাতের মুরুব্বীগণ।

বারিধারা ওয়াজাহাতী জোড়ে শীর্ষস্তরের ওলামা নেতৃবৃন্দ বলেন, দীনে ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবন দর্শন ও জীবন ব্যবস্থা। এতে কোনো প্রকার অসম্পূর্ণতা, কোনো খুঁত্ বা অস্পষ্টতা নেই। এই দীনের প্রথম ধারক-বাহক সর্বোচ্চ দাঈ এবং ব্যাখ্যাদাতা হলেন সর্বশেষ ও সর্বশ্রেষ্ঠ রাসূল হুযূর আকরাম সা.। পরবর্তী দাঈ ও ব্যাখ্যাদাতা হলেন, সাহাবী, তাবিঈ, তাবে-তাবিঈ এবং তাঁদেরই হুবহু অনুসারী আকাবিরে উলামা ও সালাফে সালিহীন।

উলামায়ে কেরাম বলেন, ইসলামের মহান দিক-নির্দেশকগণের নির্দেশনাসমূহ যথাযথভাবে মেনেই হযরত মাওলানা ইলিয়াছ (রাহ.)এর পরিচালনায় ওলামায়ে কেরামের পরামর্শে চলে আসছিলো দাওয়াত ও তাবলীগের মুবারক কাজ। তাঁর অবর্তমানে হযরত মাওলানা ইউসুফ (রাহ.) এবং হযরত এনামুল হাসান (রাহ.) ছিলেন একই পথের পথিক। কোনো বিভ্রান্তির শিকার তারা হননি। কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয়, নিজে নিজে আমীর হয়ে গিয়ে কয়েক বছর যাবৎ বিভ্রান্তি সৃষ্টি করছেন মাওলানা সা’দ সাহেব। তার সৃষ্ট মৌলিক তিনটি বিভ্রান্তি হলো- ১. তিনি শ্রেষ্ঠ আসমানী কিতাব কুরআনে কারীমের মনগড়া ব্যাখ্যা করছেন। ২. তাবলীগের গুরুত্ব বুঝাতে গিয়ে তিনি দীন প্রতিষ্ঠা ও প্রচারের অন্যান্য অপরিহার্য কর্মসূচীসমূহকে হেয় করার অপচেষ্টায় মেতেছেন। ৩. তিনি তাবলীগের ধারার মাঝে এমন কিছু ঢুকিয়েছেন, যা কুরআন-সুন্নাহ এবং পূর্ব মুরুব্বীগণের উত্তম আদর্শের খেলাফ।

তারা বলেন, এসব বিভ্রান্তি তাবলীগের মুবারক মেহনতের উন্নতির পথে অন্তরায় এবং মুসলিম সমাজে অনৈক্য, বিশৃংখলা ও গোমরাহী সৃষ্টির কারণ বলে প্রমাণিত হচ্ছে। সুতরাং আজকের এই ওয়াযাহাতী জোড় মাওলানা সা’দ সাহেব এবং তার সাথে সংশ্লিষ্ট বিষয়ে নিম্নোক্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। যথা-

১। যেহেতু- মাওলানা সা’দ সাহেব হযরত মাওলানা এনামুল হাসান রাহ.-এর রেখে যাওয়া শূরায়ী নেযামকে উপেক্ষা করে নিজেই নিজেকে আমীর দাবী করেছেন, যা শরীয়ত বিরোধী, তাই তার ও তার অনুসারীদের কোনো সিদ্ধান্ত বা ফয়সালা বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করা যাবে না।

২। দারুল উলূম দেওবন্দের মতামত হলো, মাওলানা সা’দ সাহেব আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের মতাদর্শ থেকে সরে গিয়ে নতুন কোন ফেরকা গঠনের প্রচেষ্টা চালাচ্ছেন। এহেন পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের কোনো জামাত বা ব্যক্তিকে নিযামুদ্দীনে পাঠানো বা কারো যাওয়া মুনাসিব হবে না। অনুরূপ নিযামুদ্দীন থেকে আগত কোনো জামাতকে বাংলাদেশে কাজ করার সুযোগ দেওয়া যাবে না।

৩। বাংলাদেশের তাবলীগের কাজ পূর্বে উল্লেখিত তিন হযরতের পদ্ধতিতে এবং উলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে পরিচালিত হবে। নতুন কোনো পদ্ধতি চালু করা যাবে না।

৪। কাকরাইল মসজিদের যে সকল শূরা সদস্য আমরণ মাওলানা সা’দ সাহেবের ভ্রান্ত আকীদা অনুসরণে শরীয়ত পরিপন্থী হলফ করেছেন, তারা শূরা সদস্য থাকার যোগ্যতা হারিয়ে ফেলেছেন। অতএব, তাদের পাঠানো কোন জামাতকে বাংলাদেশের কোথাও কাজ করার সুযোগ দেওয়া যাবে না।

৫। ২০১৮ ঈ. সনের বিশ্ব ইজতেমার পূর্বে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহোদয়ের সভাপতিত্বে ত্রিপক্ষীয় বৈঠকে অর্থাৎ কাকরাইলের আহলে শূরা, শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীসহ ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সমন্বয়ে অনুষ্ঠিত বৈঠকে গৃহীত সিদ্ধান্তসমূহের বাস্তবায়ন অব্যাহত রাখার জোর আহবান জানানো যাচ্ছে। সিদ্ধান্তগুলো নিম্নরূপ-

(ক) মাওলানা সা’দ সাহেব দারুল উলূম দেওবন্দের সাথে মতপার্থক্য দূর করত: দারুল উলূম দেওবন্দের আস্থা অর্জন না করা পর্যন্ত বাংলাদেশে আসতে পারবেন না। (খ) নিজামুদ্দীনের যেসকল আকাবিরে উলামায়ে কেরাম মাওলানা সা’দ সাহেবের সাথে দ্বিমত পোষণ করে মারকায ত্যাগ করে চলে গেছেন তাদের সাথে সমস্যা নিরসন করে একসাথে বাংলাদেশে আসবেন, একা আসতে পারবেন না।

৬। বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশ ও জাতির শান্তি-শৃঙ্খলা রক্ষার্থে উল্লিখিত বিষয়সমূহের সমাধান না হওয়া পর্যন্ত মাওলানা সা’দ সাহেবের কোনো পরামর্শ ও নির্দেশনা তাবলীগের সাথী ভাইগণ বাস্তবায়নের চেষ্টা করবেন না; বরং এই বাংলাদেশে দাওয়াত ও তাবলীগের মেহনত কাকরাইল মারকাযের ওলামা শূরাগণের পরামর্শক্রমেই চলবে।

৭। এবারের পাঁচ দিনের জোড় ৭, ৮, ৯, ১০ ও ১১ ডিসেম্বর, ২০১৮ ঈ. অনুষ্ঠিত হবে। ২০১৮ এর টঙ্গী ইজতেমায় সরকারের সাথে পরামর্শক্রমে আগামী ২০১৯ ঈ. এর টঙ্গী ইজতেমার জন্য নির্ধারিত তারিখ প্রথম পর্ব ১৮, ১৯, ২০ জানুয়ারি ও দ্বিতীয় পর্ব ২৫, ২৬, ২৭ জানুয়ারির সাথে আজকের মজমা ঐক্যমত পোষণ করছে।

৮। কাকরাইল মারকাযের ওলামা শূরার চিঠিপত্র ছাড়া কোনো তাকাজা বাংলাদেশে বাস্তবায়ন করা যাবে না।

কুরআন-হাদীস বিরোধী মাওলানা সা’দ সাহেবের কিছু জঘন্য বক্তব্য ও ভ্রান্ত প্রচারণা

০১। ইসলামের বিশুদ্ধতম আকীদা মতে হিদায়াত আল্লাহর হাতে। তিনি যাকে চান হিদায়াত দেন, যাকে চান গোমরাহ করেন। অথচ মাওলানা সা’দ সাহেব এতে দ্বিমত পোষন করে বলেছেন, “হিদায়াত আল্লাহর কাছে নাই, যদি আল্লাহর হাতে হিদায়াত থাকতো তাহলে নবী পাঠাতেন না”। এ মন্তব্যের দ্বারা তিনি কুরআন অস্বীকার করেছেন। (নাঊযুবিল্লাহ)।

০২। তিনি বলেন, “প্রত্যেককে মসজিদে এনে দীনের কথা বলা সুন্নাত। মসজিদের বাইরে গিয়ে দীনের দাওয়াত দেয়া সঠিক নয়। মসজিদের বাইরে অন্য কোথাও হিদায়াত পাওয়া যাবে না”। এ কথাটি রাসূলের হাদীস ও সাহাবায়ে কেরামের আমলের বিরোধী। (নাঊযুবিল্লাহ)।

০৩। তিনি বলেন, “দীনের ঐ সকল প্রতিষ্ঠান যেখানে শুধু দীনই পড়ানো হয় যদি সেগুলোর সম্পর্ক মসজিদের সঙ্গে না থাকে, তাহলে আল্লাহর কসম! সেখানে পাঠদান থাকবে কিন্তু দীন থাকবে না এবং মাদরাসায় যাকাত দিলে যাকাত আদায় হবে না”। এ কথার দ্বারা তিনি মাদরাসা বন্ধের অপচেষ্টা করেছেন এবং শরীয়তে ইসলামীর বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছেন।

০৪। তিনি বলেন, “ক্যামেরাওয়ালা মোবাইল রাখা হারাম এবং পকেটে ক্যামেরাওয়ালা মোবাইল রেখে নামায হয় না। যে আলেমগণ ক্যামেরাওয়ালা মোবাইল রাখাকে জায়েয বলেন, বারবার কসম খেয়ে তিনি বলেন, তারা হলো উলামায়ে ছু”। তিনি আরো বলেন, “মোবাইলে কুরআন শরীফ পড়া ও শোনা প্র¯্রাবের পাত্রে দুধপান করার মত”। (নাঊযুবিল্লাহ)।

০৫। তিনি বলেন, “কুরআন শরীফ শিখিয়ে যারা বেতন গ্রহণ করেন, তাদের বেতন বেশ্যার উপার্জনের চেয়েও নিকৃষ্ট। যে ইমাম এবং শিক্ষক বেতন গ্রহণ করেন বেশ্যারা তাদের আগে জান্নাতে যাবে”। (ধৃষ্টতাপূর্ণ মিথ্যাচার!) (নাঊযুবিল্লাহ)।

০৬। তিনি বলেন, “এই এক তাবলীগই নবুওয়তের কাজ। এ ছাড়া দীনের যত কাজ আছে- দীনী ইলম শিখানো, দীনী ইলম শিখা, আত্মশুদ্ধি, কিতাবাদী রচনা করা কোনোটাই নবুওয়তের কাজ নয়”। এই মন্তব্যটি সরাসরি কুরআন-হাদীস বিরোধী।

০৭। তিনি বলেন, “তাবলীগের ছয় নাম্বারই পুরা দীন। যে ব্যক্তি ছয় নাম্বার ব্যতিত অন্য কোথাও দীন তালাশ করবে, সে সফলকাম হতে পারবে না।” (ধৃষ্টতাপূর্ণ মিথ্যাচার!)

০৮। তিনি নিজেকে আমীর দাবী করে বলেন, “আল্লাহর কসম! আমি তোমাদের আমীর। যে আমাকে আমীর মানবে না সে জাহান্নামে যাবে”। অথচ হাদীসে রয়েছে, যে ব্যক্তি নিজে থেকে কোন পদ পেতে চায় তাকে সে পদ প্রদান করা হবে না।

০৯। “আপনাদের কাছে সবচেয়ে বড় গুনাহ চুরি করা, যিনা করা। আমার কাছে এরচেয়ে বড় গুনাহ হল খুরুজ না হওয়া। তাবলীগে বের না হওয়া। খুরুজ না হওয়ায় হযরত কা’ব ইবনে মালেক রা. এর সঙ্গে ৫০ দিন পর্যন্ত কথাবার্তা বন্ধ রাখা হয়”। ভ্রান্তবাদী মাও. সাদের এই কথা সত্যের অপলাপ।

১০। তিনি তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির ব্যাপারে বারবার এ কথা বলে থাকেন যে, “এটি চূড়ান্ত কথা। এ কথা তো আল্লাহর পক্ষ থেকে চূড়ান্ত”। অথচ সে কথা না কুরআনে আছে, না হাদীস শরীফে আছে। যেমন, তিনি বলেছেন- “এ কথাতো আল্লাহর ফায়সালা যে, কিয়ামত পর্যন্ত এই বাংলাওয়ালী মসজিদই মারকায থাকবে”। (আল্লাহর উপর মিথ্যা চাপিয়ে দেয়া কত জঘন্য অপবাদ?)

১১। আসহাবে কাহাফের সঙ্গী জন্তুটি কুকুর ছিল না, বাঘ ছিল, বাঘ। এই কুরআন বিরোধী কথাটি তিনি রুজুর পরও বলেছেন। (১৭ ডিসেম্বর, ২০১৭ বাদ মাগরিব) (তথ্যসূত্র- অব্যাহত বিভ্রান্তিকর বয়ান, নিযামুদ্দীন মারকায ও নেপথ্যের কিছু কথা, দারুল উলূম দেওবন্দের ফতওয়া)।

বারিধারা মাদরাসা মাঠে অনুষ্ঠিত গতকালকের ওয়াজাহাতি জোড়ে শীর্ষস্থানীয় উলামায়ে কেরাম ও তাবলীগের মুরুব্বীদের মধ্যে বয়ান পেশ করেন- জামিয়া মাদানিয়া বারিধারার শায়খুল হাদীস আল্লামা উবায়দুল্লাহ ফারুক, প্রখ্যাত মুফাসসিরে কুরআন আল্লামা নূরুল ইসলাম ওলীপুরী, জামিয়া রহমানিয়া আরাবিয়া-মুহাম্মদপুর-এর শায়খুল হাদীস মাওলানা মনসূরুল হক, মারকাযুদ্দাওয়া আল ইসলামিয়ার শায়খুল হাদীস মাওলানা আব্দুল মালেক, শায়েখ জাকারিয়া ইসলামিক রিচার্স সেন্টার-এর পরিচালক মুফতি মিযানুর রহমান সাঈদ, জামিয়া মাদানিয়া বারিধারার নায়েবে মুহতামিম হাফেজ মাওলানা নাজমুল হাসান, ইসলামিক রিচার্স সেন্টার বসুন্ধরা’র মুফতি মাওলানা এনামুল হক ও মুফতি মাওলানা আব্দুস সালাম, মসজিদে তাক্বওয়া-উত্তরা’র খতীব মাওলানা কেফায়াতুল্লাহ আযহারী, দারুল উলূম টঙ্গী’র মুহতামিম মাওলানা মাসউদুল করীম এবং জামেয়া ইসলামিয়া মেফতাহুল উলূম মধ্য বাড্ডা’র পরিচালক মাওলানা আবুল হাসান প্রমুখ।